Showing posts with label রাজনীতিবিদ. Show all posts
Showing posts with label রাজনীতিবিদ. Show all posts

Tuesday, October 20, 2015

আব্রাহাম লিঙ্কন (খ্রিষ্টপূর্ব ১৮০৯-১৮৬৫)

আব্রাহাম লিঙ্কন শুধু আমেরিকান নন, পৃথিবীর ইতিহাসের যে কয়জন মানবতাবাদী গণতন্ত্রপ্রেমী মহান রাষ্ট্রনায়ক জন্মগ্রহণ করেছেন তিনি তাদের অন্যতম। লিঙ্কনের জন্ম হয় আমেরিকার কেন্টাকি প্রদেশের একটি ছোট গ্রামে। লিঙ্কনের বাবা টমাস লিঙ্কন ছিলেন ছুতোর মিস্ত্রি। লেখাপড়া কিছুই জানতেন না। অতি কষ্টে দীনদরিদ্রের মতো তিনি সংসার চালাতেন। লিঙ্কনের যখন চার বছর বয়স তার বাবা ইন্ডিয়ানা প্রদেশের অরণ্যময় অঞ্চলে গিয়ে পাকাপাকিভাবে বসবাস করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। বাড়ির চারদিকে জন্তু-জানোয়ারের হাত থেকে বাঁচার জন্য বড় বড় খুঁটি পোঁতা থাকত। কাঠের কাজ আর শিকার করেই লিঙ্কনের বাবা সংসার চালাতেন। এই কঠিন প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে করতে লিঙ্কন হয়ে ওঠেন পরিশ্রমী সাহসী। 

লিঙ্কনের তখন ছয় বছর বয়স। হঠাৎ তার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন সেখানে কোনো চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল না। এক গ্রাম্য ডাক্তার থাকতেন পঁয়ত্রিশ মাইল দূরে। প্রায় বিনা চিকিৎসাতেই সাত দিন পর মারা গেলেন লিঙ্কনের মা। মা মারা যাওয়ার পর একটি বছর অতিক্রান্ত হলো। লিঙ্কনের বাবার পূর্বপরিচিত এক মহিলার কিছুদিন আগে স্বামী মারা গিয়েছিল। সংসারে একজন মহিলার প্রয়োজন বিবেচনা করেই তাকে বিয়ে করে নিয়ে এলেন টমাস। সৎ মায়ের আগ্রহে তিনি শিখেছিলেন লিখতে, পড়তে, অঙ্ক করতে। পরবর্তীকালে তিনি লিখেছেন, আমার স্কুল জীবন সর্বসাকল্যে এক বছরের বেশি নয়।
 
ধীরে ধীরে কৈশোর অতিক্রম করে যৌবনে পা দিলেন লিঙ্কন। দীর্ঘ দেহ, উচ্চতায় ছয় ফুট চার ইঞ্চি। লম্বা হাত, বলিষ্ঠ দেহ। দেহ অনুপাতে মাথাটি ছোট, যখন হাঁটতেন শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ত। উনিশ বছরে পা দিলেন লিঙ্কন। এই সময় নিউ অর্লিয়েন্স বন্দরে কিছু পণ্য নিয়ে যাওয়ার ভার পড়ল তার ওপর। একটি বড় নৌকা বোঝাই পণ্য নিয়ে রওনা হলেন লিঙ্কন। যথাসময়ে এসে পৌঁছালেন নিউ অর্লিয়েন্সে। এখানে এসেই লিঙ্কন প্রথম দেখলেন নিগ্রো শিশু নারী পুরুষদের দাস হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। দাসপ্রথার ব্যাপকতা দেখে তিনি এতখানি বিচলিত হয়ে পড়েছিলেন তার এক সঙ্গীকে বলেছিলেন যদি আমি কোনো দিন সুযোগ পাই এই জঘন্য প্রথার বিরুদ্ধে চরম আঘাত হানব। 

নিউ অর্লিয়েন্সের বন্দরে পণ্য বিক্রয় করে যথেষ্ট লাভ করলেন লিঙ্কন। তার কাজে খুশি হয়ে পণ্যের মালিক তাকে নিউসালেমের গুদামে ম্যানেজার করে দিলেন। এখানে কাজের তেমন চাপ ছিল না। সমস্ত অবসরটুকু তিনি নানা বিষয়ের বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকতেন। প্রকৃতপক্ষে এখানেই তার রাজনৈতিক কাজকর্মের সাথে পরিচয় হয়। একটি প্রাদেশিক নির্বাচনের সময় তিনি নির্বাচন কেন্দ্রে কাজকর্ম দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। নিজের অজ্ঞাতসারেই রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। লিঙ্কনের মধুর ব্যক্তিত্ব, তার জ্ঞান, সহযোগিতামূলক আচরণ, স্পষ্টবাদিতার কারণে অল্পদিনে তিনি নিউসালেমে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এই সময় তিনি পরিচিত হলেন স্থানীয় একটি সরাইখানার মালিক জেমস রুটলেজর সাথে। তিনি লিঙ্কনকে স্থানীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করার জন্য উৎসাহিত করেন।
জেমসের সাথে থাকত তার একমাত্র মেয়ে অ্যানি। সুন্দর চেহারা, মধুর ব্যবহার। জীবনে এই প্রথম কোনো নারীর সংস্পর্শে এলেন লিঙ্কন। প্রথম পরিচয়ে মুগ্ধ হলেন। কিন্তু অল্প কয়েক দিনে জানতে পারলেন, অ্যানি ম্যাকলিন নামের এক যুবকের বাগদত্তা। সাময়িক আঘাত পেলেও মনকে শক্ত করে নিলেন লিঙ্কন।

ইলিনয় প্রদেশের প্রাদেশিক নির্বাচন শুরু হয়েছে। কয়েকজনের উৎসাহে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন লিঙ্কন। কিন্তু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অভাবে তিনি নির্বাচনে পরাজিত হলেন। হাতে কোনো কাজ নেই, নির্বাচনে সাফল্য পেলেন না। বাধ্য হয়ে নিউসালেমে পিয়নের চাকরি নিলেন।

১৮৩৪ সালে আবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন। এবার তিনি জয়লাভ করলেন। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তাকে যেতে হলো ইলিনয়ে। পরিষদের কাজকর্মের অবসরে অখণ্ড সময়, তেমন কোনো পরিচিত মানুষজন নেই। লিঙ্কন স্থির করলেন তিনি আইন পরীক্ষা দিয়ে ওকালতি করবেন। শহরের লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়াশোনা শুরু করলেন।

১৮৩৬ সালে লিঙ্কন কৃতিত্বের সাথে আইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ওকালতি আরম্ভ করলেন। বিচিত্র পোশাক-পরিচ্ছদ থাকা সত্ত্বেও অল্প দিনেই লিঙ্কন আইনজীবী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেন। একটি বড় কারণ ছিল তার সততা, নির্লোভ মন। তিনি কখনো কোনো অন্যায়কে মেনে নিতেন না। যদি তিনি বুঝতে পারতেন মিথ্যা মোকদ্দমায় তাকে নিযুক্ত করা হয়েছে সাথে সাথে ওকালতনামা ফিরিয়ে দিতেন।

আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেয়ে রাজনীতির প্রতিই লিঙ্কন ক্রমশ আকৃষ্ট হয়ে পড়লেন। ১৮৩৮-১৮৪০ সালে পরপর দুবার তিনি ব্যবস্থাপক সভার সভ্য হিসেবে নির্বাচিত হলেন। এই সময় ব্যবস্থাপক সভার আরেক সভ্যের সাথে পরিচয় হলো লিঙ্কনের। তার নাম স্টিফেন ডগলাস। এই ডগলাস পরবর্তী জীবনে ছিলেন লিঙ্কনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূত্রপাত এক নারীকে কেন্দ্র করে। মেরি টড নামের এক সুন্দরী তরুণী তার বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। এক রাত্রে ডগলাস আর লিঙ্কন গিয়েছেন নাচের আসরে। সেই আসরে এসেছে মেরি। ডগলাস ছিলেন সুদর্শন। অপর দিকে লিঙ্কন ছিলেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত, তার মধ্যে প্রকাশ পেত এক আদিম রুক্ষতা। লিঙ্কনের সেই রুক্ষতার প্রতিই আকৃষ্ট হলেন মেরি। কিছুদিন পর মেরিকে বিবাহের প্রস্তাব করলেন লিঙ্কন। কিন্তু মেরি ছিলেন উচ্চাকাঙক্ষী, তাছাড়া সন্দেহ, ঈর্ষাবোধও ছিল প্রবল। কোনো কিছুতেই সহজে মানিয়ে নিতে পারতেন না। বিবাহের ব্যাপারে কিছুতেই লিঙ্কনের সাথে একমত হতে পারছিলেন না। এই সময় লিঙ্কন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লেন। সুস্থ হয়ে উঠতেই মেরি বিবাহের সম্মতি দিলেন। ১৮৪২ সালের ৪ নভেম্বর তাদের বিবাহ হলো। বিয়ের পর লিঙ্কন স্থির করলেন যৌথ উদ্যোগে আইন ব্যবসা শুরু করবেন। দীর্ঘদিন আইনের ব্যবসা করা সম্ভবপর হলো না লিঙ্কনের। কারণ তার স্ত্রী মেরি স্থানীয় ব্যবস্থাপক সভার সভ্য হিসেবে লিঙ্কনের কাজকর্মকে মেনে নিতে পারছিলেন না। মেরির ইচ্ছা ছিল লিঙ্কন কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভার সভ্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করুক।

রাজনীতির স্রোতে পুরোপুরি নিজেকে ভাসিয়ে দিলেন লিঙ্কন। অল্পদিনের মধ্যেই ইলিনয়ের রাজনৈতিক জগতে নিজেকে অন্যতম প্রধান ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন। অবশেষে ১৮৪৭ সালে ওয়াশিংটন পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হলেন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি প্রত্যক্ষ করলেন ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ হোয়াইট হাউসের অদূরেই গড়ে উঠেছে নিগ্রো দাসদের খোঁয়াড়। বিভিন্ন জায়গা থেকে নিগ্রো দাসদের এখানে নিয়ে আসা হতো তারপর দক্ষিণের বাজারে চালান করে দেয়া হতো। দীর্ঘদিন ধরেই লিঙ্কন ছিলেন এই প্রথার বিরোধী। তিনি মনে করতেন এই প্রথা যদি অন্যায় না হয় তবে পৃথিবীতে কোনো কিছুই অন্যায় নয়। লিঙ্কন পার্লামেন্টের সভায় কলম্বিয়া প্রদেশে দাসব্যবসা বন্ধ করার জন্য একটি বিল উত্থাপন করলেন। সম্মিলিত বিরোধিতায় সেই বিল অগ্রাহ্য হলো। 

ব্যর্থমনোরথ লিঙ্কন ফিরে এলেন সিপ্রংফিল্ডে। আবার আইনের ব্যবসা শুরু করলেন। তিনি স্থির করেছিলেন আর রাজনীতির আঙিনায় ফিরে যাবেন না। কিন্তু নিগ্রো ক্রীতদাসদের ওপর ক্রমাগত অত্যাচার শোষণ অবিচার দেখে তিনি এতখানি বিচলিত হয়ে পড়লেন দাস ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে পুনরায় তীব্র ভাষায় সরব হয়ে উঠলেন।

১৮৫৪ সালে গড়ে উঠল নতুন রিপাবলিকান পার্টি। এই পার্টির অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন আব্রাহাম লিঙ্কন। তিনি এই দলের রাজনৈতিক আদর্শের কথা এত সুস্পষ্ট ও যুক্তিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করলেন, সমস্ত দেশ তার বাগ্মিতায় মুগ্ধ হলো। এর অল্পদিনের মধ্যে এক ঐতিহাসিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন লিঙ্কন। দক্ষিণের দেশগুলো দাসপ্রথার সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার দাবি তুলতে আরম্ভ করেছিল। ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য ডগলাস প্রবলভাবে দাসপ্রথার সমর্থন করতে আরম্ভ করলেন। লিঙ্কন তীব্র ভাষায় তার প্রতিবাদ করলেন। 

দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলো যখন বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য জোরাল দাবি পেশ করছিল লিঙ্কন বলিষ্ঠ কণ্ঠে বললেন একটি রাষ্ট্র কখনো দ্বিধাবিভক্ত হতে পারে না। আমেরিকা অবশ্যই এক এবং ঐক্যবদ্ধ থাকবে। এই সময় রিপাবলিকান দলের জাতীয় সম্মেলনে সর্বসম্মতভাবে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য লিঙ্কনের নাম ঘোষণা করা হলো। রিপাবলিকান পদের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামলেন লিঙ্কন আর তার বিরুদ্ধে ডেমোক্রেটিক দলের হয়ে প্রার্থী হলেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ডগলাস

আমেরিকার অধিকাংশ জনগণই সেদিন উপলব্ধি করতে পেরেছিল রাষ্ট্রের এই চরম সংকটের মুখে যিনি যোগ্য হাতে নেতৃত্ব দিতে পারবেন তিনি একমাত্র লিঙ্কন। ডগলাসকে হারিয়ে লিঙ্কন আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলেন।  ১৮৬১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লিঙ্কন সিপ্রংফিল্ড ছেড়ে ওয়াশিংটনের দিকে রওনা হলেন। সঙ্গে স্ত্রী মেরি। তার এত দিনের স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু এই জয় আমৃত্যু লিঙ্কনের সমস্ত মানসিক শান্তিকে কেড়ে নিয়েছিল।

মার্চ মাসের চার তারিখে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেন। উপস্থিত স্বল্পসংখ্যক মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে দীপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন দেশ থেকে দাসপ্রথা নির্মূল করতে হবে এবং কোনো কারণেই দেশ বিভক্ত হবে না। দাসপ্রথা সমর্থনের ব্যাপারে ইতিপূর্বে উত্তর ও দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলোর মতবিরোধ ছিল। দক্ষিণের রাষ্ট্রগুলো স্থির করল তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। সাউথ ক্যারোলিনার নেতৃত্বে আলাবামা, ফ্লোরিডা, মিসিসিপি, লুসিয়ানা, টেক্সাস ও জর্জিয়া যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ঘোষণা করে এক পৃথক যুক্তরাষ্ট্র স্থাপন করল। এই নবঘোষিত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হিসেবে জেফারসন ডেভিসের নাম ঘোষণা করা হলো। 

লিঙ্কন চেয়েছিলেন দাসপ্রথা নির্মূল হোক, কিন্তু দেশ বিভক্ত হলে কখনোই তার সেই ইচ্ছা পূর্ণ হবে না। তাই নিজের সীমিত শক্তিকে সম্বল করেই দক্ষিণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। শুরু হলো আমেরিকার রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ

১৮৬৩ সালের ১ জানুয়ারি লিঙ্কন চূড়ান্তভাবে ক্রীতদাসদের মুক্তি ঘোষণায় স্বাক্ষর দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনত ক্রীতদাস প্রথার অবসান ঘটল। এই ঘোষণায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমি আব্রাহাম লিঙ্কন আদেশ দিচ্ছি এবং ঘোষণা করছি যে উল্লিখিত রাষ্ট্রগুলোতে ক্রীতদাসরূপে যারা বন্দি রয়েছে তারা এখন থেকে স্বাধীন মুক্ত।’ এই আদেশ জারি করার সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘যদি কোনো দিন আমার নাম ইতিহাসে স্থান পায় তাহলে আমার এই কাজটির জন্যই পাবে, এতে আমি নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সমর্পণ করেছি।’ 

যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে দক্ষিণের সেনাপতি লির অসাধারণ নৈপুণ্যের জন্য উত্তরাঞ্চলের সেনাবাহিনী যুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে পরাজিত হতে থাকে। লিঙ্কন দেশের সমস্ত মানুষের কাছে আহ্বান জানালেন যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে সৈন্যদলে নাম লেখাল চল্লিশ বছরের এক প্রাক্তন ক্যাপ্টেন, নাম গ্র্যান্ট। গ্র্যান্ট সৈনিক হিসেবে ছিলেন খুব বীর সাহসী। কিন্তু তার প্রধান দোষ ছিল অত্যধিক পরিমাণে মদ্যপান করতেন আর এই দোষেই তার চাকরি গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত গ্র্যান্টের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পিছু হটতে আরম্ভ করলেন লি। দক্ষিণের একটার পর একটা শহর তার হাতছাড়া হয়ে গেল। শেষে লি আশ্রয় নিলেন রিচমন্ড শহরে। শহরের উপকণ্ঠে তখন গ্র্যান্টের কামান গর্জন করছে। এখন শুধু অপেক্ষা লির আত্মসমর্পণের।

দেশবাসীর কাছে লিঙ্কন তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, ‘কারোর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে সকলের প্রতি উদার মনোভাব নিয়ে…আসুন আমরা সকলে মিলে আরদ্ধ কাজগুলো শেষ করি। জাতির ক্ষত আরোগ্য করা, এই যুদ্ধের গুরুভার যিনি বহন করেছেন তাকে অথবা তার বিধবা পত্নী ও পিতৃহীন সন্তানদের পালন করা, নিজেদের মধ্যে ও সকল জাতির সঙ্গে ন্যায্য এবং স্থায়ী শান্তি অর্জন ও পোষণের ব্যবস্থা-এই আমাদের কর্তব্য।’ অবশেষে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর যুদ্ধ শেষ হলো। লি আত্মসমর্পণ করলেন

ওয়াশিংটনে ফিরে এলেন লিঙ্কন। শত শত মানুষের অভিনন্দনের জোয়ারে ভেসে গেলেন তিনি। জনগণের ভিড় কমতেই একে একে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা এসে ভিড় করে সেখানে। এখনো কত কাজ বাকি। রাতের বেলায় থিয়েটারে যাওয়ার কথা। অনেকটা মেরির অনুরোধেই তিনি রাজি হলেন। থিয়েটার হলে পৌঁছাতেই সমস্ত দর্শক তাকে অভিনন্দন জানাল। নিজের আসনে গিয়ে বসলেন লিঙ্কন আর মেরি। দু ঘণ্টা কেটে গেছে, বক্সের দরজার সামনে যে প্রহরী ছিল তার কাছে একজন লোক এসে বলল প্রেসিডেন্টকে একটা সংবাদ দিতে হবে। রক্ষী ভেতরে যাওয়ার অনুমতি দিতেই আততায়ী ভেতরে ঢুকেই লিঙ্কনের মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালাল। চেয়ারের ওপর লুটিয়ে পড়লেন লিঙ্কন। লিঙ্কনকে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো থিয়েটার হলের সামনের একটা বাড়িতে। আঘাতের বিরুদ্ধে তার বলিষ্ঠ দেহের প্রাণসত্তার দ্বন্দ্ব চলল নয় ঘণ্টা ধরে। লিঙ্কন অচেতন, সেখানে উপস্থিত মেরি, লিঙ্কনের বড় ছেলে, তার মন্ত্রিপরিষদের সবাই। সকাল সাতটায় অজ্ঞান অবস্থায় লিঙ্কন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন

মৃত্যুর সময় লিঙ্কনের বয়স হয়েছিল ছাপ্পান্ন বছর। এই জীবনের মধ্যেই তিনি যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অখণ্ডতা এবং মানুষের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য সংগ্রাম করেছেন তাই নয়, তিনি তার কাজের মধ্যে দিয়ে মানুষের মর্যাদার দিগন্তকে প্রসারিত করেছেন। তার জীবনকে উৎসর্গ করেছেন।

Read More »

অ্যাডলফ হিটলার

অ্যাডলফ হিটলার  (খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৮৯-১৯৪৫)

হিটলারের জন্ম ১৮৮৯ সালের ২০ এপ্রিল অস্ট্রিয়া ব্যাভেরিয়ার মাঝামাঝি ব্রনাউ নামে এক আধা গ্রাম আধা শহরে। বাবা একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামান্য চাকরি করত। যা আয় করত তার তিন পত্নী আর তাদের ছেলেমেয়েদের দুই বেলা খাবার সংকুলানই হতো না। হিটলার ছিলেন তার বাবার তৃতীয় স্ত্রীর তৃতীয় সন্তান।

ছয় বছর বয়সে স্থানীয় অবৈতনিক স্কুলে ভর্তি হলেন। ছেলেবেলা থেকেই হিটলার ছিলেন একগুঁয়ে, জেদি আর রগচটা। সামান্য ব্যাপারেই রেগে উঠতেন। অকারণে শিক্ষকদের সঙ্গে তর্ক করতেন। পড়াশোনাতে যে তার মেধা ছিল না এমন নয়। কিন্তু পড়াশোনার চেয়ে তাকে বেশি আকৃষ্ট করত ছবি আঁকা। যখনই সময় পেতেন কাগজ পেন্সিল নিয়ে ছবি আঁকতেন

এগারো বছর বয়সে ঠিক করলেন আর পড়াশোনা নয়, এবার পুরোপুরি ছবি আঁকতেই মনোযোগী হবেন। বাবার ইচ্ছা ছিল স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে কোনো কাজকর্ম জুটিয়ে নেবে। বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই স্কুল ছেড়ে দিলেন হিটলার। স্থানীয় এক আর্ট স্কুলে ভর্তির চেষ্টা করলেন। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না। একটা বেসরকারি স্কুলে ভর্তি হলেন। কিন্তু কয়েক মাস পর অর্থের অভাবে স্কুল ছেড়ে দিলেন

মা মারা গেলে সংসারের সব বন্ধন ছিন্ন হয়ে গেল। ভাগ্য অন্বেষণে বেরিয়ে পড়লেন হিটলার। ভিয়েনাতে চলে এলেন। ভিয়েনাতে এসে তিনি প্রথমে মজুরের কাজ করতেন। কখনো মাল বইতেন। এরপর রং বিক্রি করতে আরম্ভ করলেন। ভিয়েনাতে থাকার সময়েই তার মনের মধ্যে প্রথম জেগে ওঠে ইহুদি বিদ্বেষ। তখন জার্মানির অধিকাংশ কলকারখানা, সংবাদপত্রের মালিক ছিল ইহুদিরা। দেশের অর্থনীতির অনেকখানিই তারা নিয়ন্ত্রণ করত। হিটলার কিছুতেই মানতে পারছিলেন না, জার্মান দেশে বসে ইহুদিরা জার্মানদের উপরে প্রভুত্ব করবে

১৯১২ সালে তিনি ভিয়েনা ছেড়ে এলেন মিউনিখে। সেই দুঃখ-কষ্ট আর বেঁচে থাকার সংগ্রামে আরো দুই বছর কেটে গেল। ১৯১৪ সালে শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। হিটলার সৈনিক হিসেবে যুদ্ধে যোগ দিলেন। এই যুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের পরিচয় দিলেও কোনো পদোন্নতি হয়নি। যুদ্ধ শেষ হলো। দেশজুড়ে দেখা দিল হাহাকার আর বিশৃঙ্খলা। তার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল বিভিন্ন বিপ্লবী দল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। এদের ওপর গোয়েন্দাগিরি করার জন্য হিটলারকে নিয়োগ করলেন কর্তৃপক্ষ।

সেই সময় প্রধান রাজনৈতিক দল ছিল লেবার পার্টি। তিনি সেই পার্টির সদস্য হলেন। অল্পদিনেই পাকাপাকিভাবে পার্টিতে নিজের স্থান করে নিলেন হিটলার। এক বছরের মধ্যেই তিনি হলেন পার্টিপ্রধান। দলের নতুন নাম রাখা হলো ন্যাশনাল ওয়ার্কার্স পার্টি। পরবর্তীকালে এই দলকেই বলা হতো নাৎসি পার্টি। ১৯২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম নাৎসি দলের সভা ডাকা হলো। এতেই হিটলার প্রকাশ করলেন তার পঁচিশ দফা দাবি

এরপর হিটলার প্রকাশ করলেন স্বস্তিকা চিহ্নযুক্ত দলের পতাকা। ক্রমশই নাৎসি দলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। তিন বছরের মধ্যেই দলের সদস্য হলো প্রায় ৫৬০০০ এবং এটি জার্মান রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করল।
হিটলার চেয়েছিলেন মিউনিখে অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব যেন না থাকে। এই সময় তার পরিকল্পিত এক রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হলো। পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন। তাকে এক বছরের জন্য ল্যান্ডসবার্গের পুরনো দুর্গে বন্দি করে রাখা হলো। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে আবার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র কাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তার উগ্র স্পষ্ট মতবাদ, বলিষ্ঠ বক্তব্য জার্মানদের আকৃষ্ট করল। দলে দলে যুবক তার দলের সদস্য হতে আরম্ভ করল। সমস্ত দেশে জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠলেন হিটলার।

১৯৩৩ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোট পেলেন কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেন না। পার্লামেন্টের ৬৪৭টির মধ্যে তার দলের আসন ছিল ২৮৮। বুঝতে পারলেন ক্ষমতা অর্জন করতে গেলে অন্য পথ ধরে অগ্রসর হতে হবে। কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠ না হওয়ায় হিটলার পার্লামেন্ট ভেঙে দিলেন। এবার ক্ষমতা দখলের জন্য শুরু হলো তার ঘৃণ্য রাজনৈতিক চক্রান্ত। বিরোধীদের অনেকেই খুন হলেন। অনেকে মিথ্যা অভিযোগে জেলে গেল। বিরোধী দলের মধ্যে নিজের দলের লোক প্রবেশ করিয়ে দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করলেন। অল্পদিনের মধ্যেই বিরোধী পক্ষকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে হিটলার হয়ে উঠলেন শুধু নাৎসি দলের নয়, সমস্ত জার্মানির ভাগ্যবিধাতা।

হিটলারের এই উত্থানের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ইহুদিদের বিরুদ্ধে তার প্রচার। তিনিই জার্মানদের মধ্যে ইহুদি বিদ্বেষের বীজকে রোপণ করেছিলেন। দেশ থেকে ইহুদি বিতাড়নই ছিল তার নাৎসি বাহিনীর প্রধান উদ্দেশ্য। দেশের প্রান্তে প্রান্তে ইহুদি বিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। শুরু হলো তাদের ওপর লুটতরাজ, হত্যা। হিটলার চেয়েছিলেন এভাবে ইহুদিদের দেশ থেকে বিতাড়ন করবেন। কিন্তু কোনো মানুষই সহজে নিজের আশ্রয়স্থল ত্যাগ করতে চায় না।

১৯৩৫ সালে নতুন আইন চালু করলেন হিটলার। তাতে দেশের নাগরিকদের দুটি ভাগে ভাগ করা হলো, জেন্টিল আর জু। জেন্টিল অর্থাৎ জার্মান, তারাই খাঁটি আর্য, জু হলো ইহুদিরা। তারা শুধুমাত্র জার্মান দেশের বসবাসকারী, এদেশের নাগরিক নয়। প্রয়োজনে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। দেশজুড়ে জার্মানদের মধ্যে গড়ে তোলা হলো তীব্র ইহুদি বিদ্বেষী মনোভাব।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর ইউরোপের মিত্রপক্ষ ও জার্মানদের মধ্যে যে ভার্সাই চুক্তি হয়েছিল তাতে প্রকৃতপক্ষে জার্মানির সমস্ত ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছিল। ১৯৩৩ সালে হিটলার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জার্মানির হৃৎ গৌরব পুনরুদ্ধার করার সংকল্প গ্রহণ করেন এবং তিনি একে একে ভার্সাই চুক্তির শর্তগুলো মানতে অস্বীকার করে নিজের শক্তি ক্ষমতা বিস্তারে মনোযোগী হয়ে ওঠেন।

১৯৩৪ সালে হিটলার রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে নিজেকে জার্মানির ফুয়েরার হিসেবে ঘোষণা করেন এবং অল্পদিনের মধ্যে নিজেকে দেশের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তার এই সাফল্যের মূলে ছিল জনগণকে উদ্দীপিত করার ক্ষমতা। তিনি দেশের প্রান্তে প্রান্তে ঘুরে ঘুরে জনগণের কাছে বলতেন ভয়াবহ বেকারত্বের কথা, দারিদ্র্যের কথা, নানা অভাব-অভিযোগের কথা।

হিটলার তার সমস্ত ক্ষমতা নিয়োগ করলেন দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে। তার সহযোগী হলেন কয়েকজন সুদক্ষ সেনানায়ক এবং প্রচারবিদ। দেশের বিভিন্ন সীমান্ত প্রদেশে বিশাল সৈন্য সমাবেশ করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই সন্ধির চুক্তি ভঙ্গ করে রাইনল্যান্ড অধিকার করলেন। অস্ট্রিয়া ও ইতালি ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ হলো জার্মানির সাথে।
ইতালির সর্বাধিনায়ক ছিলেন মুসোলিনি। একদিকে ইতালির ফ্যাসিবাদী শক্তি অন্যদিকে নাৎসি জার্মানি। বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে ইতালি। প্রথমে আলবেনিয়া ও পরে ইথিওপিয়ার বেশ কিছু অংশ দখল করে নেয়।

অবশেষে হিটলার পোল্যান্ডের কাছে ডানজিগ ও পোলিশ করিডর দাবি করলেন। যাতে এই অঞ্চলে সৈন্য সমাবেশ ঘটাতে পারেন। পোল্যান্ডের সরকার তার এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলেন। পোল্যান্ডের ধারণা ছিল হিটলার তার দেশ আক্রমণ করলে ইউরোপের অন্য সব শক্তি তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। তাদের সম্মিলিত শক্তির সামনে জার্মান বাহিনী পরাজিত হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি বড় কারণ জার্মানির সামরিক শক্তি সম্বন্ধে ইউরোপের অন্য সব দেশের সঠিক ধারণার অভাব। আর একটি বড় কারণ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স প্রথম পর্যায়ে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হিটলার ও মুসোলিনির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায়নি। তাছাড়া ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিনের ধারণা ছিল হিটলারের ক্ষমতা শুধুমাত্র প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তাছাড়া সেই সময় ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে জার্মানির চেয়ে বড় শত্রু ছিল কমিউনিস্ট রাশিয়া। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়ার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে জার্মানরা নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে। তাই যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমস্ত শর্ত ভঙ্গ করে জার্মানরা নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করে চলেছিল তখন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স কেউ তাদের বাধা দেয়ার প্রয়োজন মনে করেনি। উপরন্তু হিটলারকে নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশের এই সুবিধাবাদী নীতির সুযোগ পুরোপুরি গ্রহণ করেছিলেন হিটলার। বিশ্বজয়ের স্বপ্নে মত্ত হয়ে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে জার্মান বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করল এবং এই দিনটি থেকেই শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

মাত্র পনেরো দিনে জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে পোল্যান্ড অধিকার করল। তারপর শুরু হলো জার্মান বাহিনীর অগ্রগমন। পোল্যান্ডের পর হিটলার দখল করলেন নরওয়ে ও ডেনমার্ক। নরওয়েতে বিরাট সংখ্যক ব্রিটিশ সৈন্য অবস্থান করছিল। তাদের অধিকাংশই নিহত হলো। এই ঘটনায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলিন পদত্যাগ করলেন। নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন চার্চিল।

এবার হিটলার দৃষ্টি ফেরাল ফ্রান্সের দিকে। ফ্রান্স ইউরোপের সর্বপ্রধান শক্তি। ফ্রান্স নিজেদের সুরক্ষার জন্য জার্মান সীমান্তে দুর্ভেদ্য ব্যূহ সৃষ্টি করেছিল। যাকে বলা হতো ম্যাজিনো। বেলজিয়াম আক্রমণ করে সেই দেশের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের সীমান্ত প্রদেশে গিয়ে উপস্থিত হলো। সোঁদায় তুমুল যুদ্ধের পর ফরাসি বাহিনী পরাজিত হলো। ফরাসিদের এই বিপর্যয়ের সুবিধা নেয়ার জন্য ইতালি নিজেকে জার্মানদের মিত্রপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করে যুদ্ধে যোগ দিল। সমস্ত ইউরোপ-আফ্রিকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ আগুন।

ইতালির রাষ্ট্রপ্রধান মুসোলিনি উত্তর আফ্রিকা অধিকার করার জন্য বিরাট সৈন্যদল পাঠালেন। অন্যদিকে হিটলার ফ্রান্স অধিকার করার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন। হিটলার অনুগত ফ্যাসিস্ট শক্তি নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মার্শাল পেত্যাকে নিযুক্ত করল। মার্শাল বিনাযুদ্ধেই হিটলারের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন

ফ্রান্স জয়ের পর জার্মানি যুগোস্লাভিয়া আর গ্রিস দেশ অধিকার করল। ইতিমধ্যে রুমানিয়া, বুলগেরিয়া ও হাঙ্গেরি জার্মানির পক্ষে যোগ দিল। এর ফলে সমগ্র দক্ষিণ ইউরোপ জার্মানির নিয়ন্ত্রণে এসে গেল। একদিকে যখন জার্মান বাহিনী বীরদর্পে একের পর এক দেশ অধিকার করে এগিয়ে চলেছে, দেশের অভ্যন্তরে হিটলার শুরু করেছেন নারকীয় ইহুদি নিধনযজ্ঞ। পৃথিবীর ইতিহাসে এই নৃশংসতার কোনো তুলনা নেই। হিটলার চেয়েছিলেন জার্মানি থেকে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে। হাজার হাজার ইহুদিকে বন্দি করা হলো। তাদের বলা হতো তোমাদের জার্মানির বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হবে। তাদের গাড়িতে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হতো জনবসতিহীন সীমান্ত অঞ্চলে। এখানে তাদের জন্য অস্থায়ী বন্দিনিবাস তৈরি করা হয়েছিল। তাকে বলা হতো ঘেট্রো। এখানে কোনো খাবার ছিল না, পানি ছিল না, তার উপরে ছিল হিটলারের বাহিনীর নির্মম অত্যাচার। অল্পদিনের মধ্যেই বেশির ভাগ মানুষই মারা পড়ত। যারা বেঁচে থাকত তাদের গুলি করে হত্যা করা হতো। নাৎসি বাহিনীর হাতে নারী-শিশু, বৃদ্ধ কারো নিস্তার ছিল না।
হাজার হাজার ইহুদিকে হত্যা করতে যে বিরাট পরিমাণ গুলি খরচ হতো তাতে জার্মান কর্তৃপক্ষ চিন্তিত হয়ে পড়লহিটলারের আদেশে তৈরি হলো গ্যাস চেম্বার। একটা বড় ঘর। চারদিকে বন্ধ। একসাথে দুইশত মানুষকে সেই ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাস ছাড়া হতো। কয়েক মিনিটের মধ্যে সেই বিষাক্ত গ্যাসে মারা পড়ত সবাই। তাদের মৃতদেহগুলো সীমান্ত অঞ্চলে বিরাট বিরাট গর্তে ছুড়ে ফেলে দেয়া হতো। তিন বছরে হিটলার প্রায় ৬০ লাখ ইহুদিকে হত্যা করেছিল। ইহুদিদের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ আর ঘৃণাই তাকে এই হত্যাকাণ্ডে প্ররোচিত করেছিল।

ফ্রান্সের পতনের পর ১৯৪১ সালের ২২ জুন সমস্ত চুক্তি ভঙ্গ করে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করল। হিটলার ভেবেছিলেন রাশিয়া অধিকার করতে পারলে সমগ্র ইউরোপ তার পদানত হবে। নেপোলিয়ানের মতো রাশিয়া আক্রমণ হিটলারের জীবনের সবচেয় বড় ভ্রান্তি। রুশ বাহিনী এই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল না। জার্মানরা প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে চলে মস্কোর দিকে। রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল অধিকার করলেও শীত আসতেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ল জার্মানরা। তারা পিছু হটতে আরম্ভ করল। এই সুযোগে রুশ গেরিলা বাহিনী আঘাত হানতে থাকে। শীত শেষ হতেই জার্মানরা নতুন উদ্যমে এগিয়ে চলে। রাশিয়ার দক্ষিণে ককেশাস তৈলক্ষেত্রসহ বহু অঞ্চল দখল করে দেয়। তারা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর প্রান্তে এসে পৌঁছায় কিন্তু রুশ বাহিনী মরণপণ সংগ্রাম করে জার্মানদের পরাজিত করে।

একদিকে যখন রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ চলছে, জেনারেল রোমেল হিটলারের নির্দেশে আফ্রিকায় আরেকটি ফ্রন্ট খুললেন। একসাথে এতগুলো ফ্রন্ট না খোলার জন্য অনেকে হিটলারকে পরামর্শ দিলেও বিশ্বজয়ের স্বপ্নে হিটলার তখন এমনই বিভোর, কারোর কোনো উপদেশ গ্রহণ করলেন না।

ইউরোপজুড়ে যখন যুদ্ধ চলছে, এশিয়ার জাপান জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিল। তারা ৭ ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে আমেরিকার পার্ল হারবার বন্দরের ওপর বোমা বর্ষণ করে বিধ্বস্ত করে ফেলল। এই ঘটনায় আমেরিকাও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল।

প্রথম দিকে জার্মান বাহিনী সর্বত্র জয়লাভ করলেও মিত্রশক্তি যখন সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ আরম্ভ করল, হিটলারের বাহিনী পিছু হটতে আরম্ভ করল। আফ্রিকায় ইংরেজ সেনাপতি মন্ট গোমারি রোমেলকে পরাজিত করলেন। এক বছরের মধ্যেই আফ্রিকা থেকে জার্মান বাহিনীকে বিতাড়িত করা হলো। ইতালিতে মুসোলিনিকে বন্দি করা হলো। ফ্যাসিবিরোধী জনগণ তাকে প্রকাশ্য রাস্তায় হত্যা করল

জার্মান বাহিনীর সবচেয়ে বড় পরাজয় হলো রাশিয়ার স্টালিনগ্রাদে। দীর্ঘ ছয় মাস যুদ্ধের পর ফৌজের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো জার্মান বাহিনী। সর্বত্রই যখন পরাজয়, নিজের অহমিকায় এতখানি উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলেন হিটলার, মিত্রশক্তিকে সামান্যতম গুরুত্ব দিতেন না। নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে তার অনেক সেনাপতিই তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। দুর্ভাগ্যবশত তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়।

হিটলার ক্রমশই সঙ্গীসাথীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে থাকেন। সকলের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। বেশির ভাগ সময়ই বাঙ্কারে থাকতেন। সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন। এই সময় তার একমাত্র সঙ্গী ছিল প্রেমিকা ইভা ব্রাউন। ইভা হিটলারকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও হিটলারকে পরিত্যাগ করেননি। হিটলার ছিলেন এক বিকৃত মানসিকতার শিকার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন সমস্ত পৃথিবী হবে তার নাৎসি বাহিনীর পদানত। নিজের স্বপ্নকে পূর্ণ করার জন্য তিনি জার্মান বাহিনীকে গড়ে তুলেছিলেন। নিজে অল্প শিক্ষিত হয়েও অনুভব করেছিলেন যুদ্ধে বিজ্ঞানের উপযোগিতা। তাই শুধু সুদক্ষ সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলেননি। তার নির্দেশে বিজ্ঞানীরা উদ্ভাবন করেছিল সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র।

অসাধারণ সংগঠন শক্তি, বুদ্ধি, প্রবল ব্যক্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও হিটলারের ধ্বংসের কারণ তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা, তার অহমিকা, রক্তপিপাসু দানবের মতো মানবজাতিকে ধ্বংস করার ইচ্ছা। ১৯৪৪ সালে লাল ফৌজ স্বদেশভূমি থেকে জার্মান বাহিনীকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে একের পর এক অধিকৃত পোল্যান্ড, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়া মুক্ত করতে করতে জার্মান ভূখণ্ডে এসে প্রবেশ করে। অন্যদিকে ইংরেজি আর আমেরিকান সৈন্যরাও জার্মানির অভিমুখে এগিয়ে চলে।

যতই চারদিক থেকে পরাজয়ের সংবাদ আসতে থাকে হিটলার উন্মত্তের মতো হয়ে ওঠেন। ১৯৪৫ সালের ২৯ এপ্রিল হিটলারের শেষ ভরসা তার স্টেইনের সৈন্যবাহিনী বিধ্বস্ত হয়ে যায়। তার অধিকাংশ সঙ্গীই তাকে পরিত্যাগ করে মিত্রপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠায়। হিটলার বুঝতে পারেন তার সব স্বপ্ন চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে গেছে। বার্লিনের প্রান্তে রুশ বাহিনীর কামানের গর্জন শোনা যাচ্ছে। হিটলার তার বারো বছরের সঙ্গিনী ইভাকে বার্লিন ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইভা তাকে পরিত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। দুজনে সেই দিনেই বিয়ে করেন। বিয়ের পর হিটলার উপস্থিত সঙ্গীদের সাথে একসঙ্গে শ্যাম্পেন পান করলেন। তারপর দুটি চিঠি লিখলেন। একটি চিঠিতে সবকিছুর জন্য ইহুদিদের অভিযুক্ত করলেন। অন্য চিঠিতে নিজের সব সম্পত্তি পার্টিকে দান করে গেলেন।

৩০ এপ্রিল ১৯৪৫
চারদিক থেকে বার্লিন অবরোধ করে ফেলে লাল ফৌজ। হিটলার বুঝতে পারেন আর অপেক্ষা করা উচিত নয়। যে কোনো মুহূর্তে লাল ফৌজ এসে তাকে বন্দি করতে পারে। তিনি তার ড্রাইভার ও আরো একজনকে বললেন, মৃত্যুর পর যেন তাদের এমনভাবে পোড়ানো হয়, দেহের কোনো অংশ যেন অবশিষ্ট না থাকে
বিকেল সাড়ে তিনটার সময় তিনি নিজের ঘর থেকে বের হয়ে তার পার্শ্বচরদের সাথে করমর্দন করে নিজের ঘরে ঢুকলেন। তারপরই শব্দ শোনা গেল। হিটলার নিজের মুখের মধ্যে গুলি করে আত্মহত্যা করলেন। আর ইভা আগেই বিষ খেয়েছেন। দুজন সৈন্য তাদের কম্বল দিয়ে মুড়ে বাগানে নিয়ে এল। চারদিক থেকে কামানের গোলা এসে পড়ছে। সেই অবস্থাতেই মৃতদেহের ওপর পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়া হলো

যিনি সমস্ত মানবজাতিকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলেন, নিজের অপরিণামদর্শিতায় শেষ পর্যন্ত নিজেই ধ্বংস হয়ে গেলেন।
Read More »

Monday, June 29, 2015

দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী

নামঃ দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী

জন্মঃ ২/২/১৯৪০ পিরোজপুর জেলায় !
.
পিতাঃ মাওলানা ইউসুফ সাঈদী !
.
১ম কারাবরণঃ ১৯৭৫ সালে !
.
হজ্বপালনঃ ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১০পর্যন্ত প্রতি বছর !
.
আল্লামা উপাধীঃ ১৯৯১সালে ইসলামিক সার্কেল অব নর্থ আমেরিকা কতৃক আল্লামা উপাধি!
.
গ্রন্হ রচনাঃ ২০টি ।
.
প্রিয় রাজনৈতিক দলঃ জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ !
.
প্রিয় ছাত্র সংগঠনঃ ছাত্রশিবির এবং ছাত্রী সংস্থা !
.
প্রিয় রাজনীতিকঃ আল্লামা মওদুদী রহঃ !
.
প্রিয় বক্তাঃ শায়খ আঃ হামিদ কিশক ,আহমদ দীদাত এবং কামালুদ্দীন জাফরী !
.
প্রিয় লেখকঃ আল্লামা মওদুদী , হাসানুল বান্না ,ডঃ মুরিস বুকাইলি,মাঃ আঃ রহিম এবং কৃষাণ চন্দর !
.
প্রিয় কবিঃ শেখ সাদী ,ওমর খৈয়াম ,ডঃ ইকবাল ,কাজী নজরুল এবং ফররুখ আহমথ !
.
প্রিয় বন্ধুঃ অধ্য্ক্ষ মাওলানা সাইয়্যেদ কামালুদ্দীন জাফরী !
.
ভয়ঃ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে !
.
ঘৃনাঃ দাম্ভিকতা ,কৃতঘ্নতা ,সময় অসচেতনতা এবং গিবত !
.
স্বপ্নঃ বাংলাদেশে ইসলামী শাসন বাস্তবায়ন !
.
কামনাঃ শহীদি মৃত্যু !
.
অবসরেঃ অধ্যয়ন ,আত্নীয় স্বজনদেরকে সঙ্গদান !
.
স্বরনীয় মুহূর্তঃ প্রথম কাবা দর্শন !
.
জীবনের আদর্শ পুরুষঃ হযরত মুহাম্মদ সাঃ !
.
২য় গ্রেফতারঃ ২৮ জুন ২০১০!
Read More »